
শীতের প্রকোপে ঠক ঠক কাঁপছে পুরো দেশ। আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, তাপমাত্রা আরও কমতে পারে সামনের দিনগুলোতে। ব্যতিক্রম নয় পাবনাও। আর এদিকে শীতের তীব্রতার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগের তীব্রতাও। যার প্রধান শিকার মূলত শিশু ও বয়স্করা। ঠান্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে চারগুণ রোগী ভর্তি হয়েছে পাবনা ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে। শীতের প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের ডায়রিয়া ও শিশু ওয়ার্ডে তিল ধারণের জায়গা মিলছে না রোগী ও তাদের স্বজনদের। রোগীর মাত্রাতিরিক্ত চাপে বারান্দার মেঝেতে বিছানা পেতে এই কনকনে শীতের মধ্যে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে শিশু রোগীদের। দিনের বেলায় একরকম হলেও রাতে চিত্রটা আরও ভয়াবহ। শিশু ওয়ার্ডের তিনটি কক্ষে বর্তমানে দুই শতাধিক ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে অর্ধশত রোগী ও তাদের স্বনজনরা অবস্থান করছেন। উপরে ও নিচে কোথাও তিল ধারণের জায়গা নেই কক্ষগুলোতে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটিতে জনবল ও চিকিৎসা সংকট চললেও এ সমস্যা সমাধানের কোনো পদক্ষেপ নেয় নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিন দেখা যায়, সন্ধ্যা রাতে স্বল্প আলোতে হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে কাঁথা ও কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে ও বসে আছেন অনেকেই। সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই অভিযোগের যেন বস্তা খুলে বসেন রোগীর স্বজনরা। সরকারি হাসপাতালে সুচিকিৎসার জন্য এলেও মিলছে না কাক্সিক্ষত সেবা। একদিকে শয্যা সংকট, অন্যদিকে ওষুধ সংকট। ভর্তি হওয়া বেশিরভাগ রোগীকে ব্যবস্থাপত্র অনুসারে ওষুধসহ কলেরা স্যালাইন কিনে আনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। দিনের প্রথম দিকে একজন চিকিৎসক রোগী দেখতে এলেও রাতের বেলায় আর মিলছে না বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। অধ্যয়নরত ইন্টার্ন চিকিৎসক দিয়ে কোনো রকমে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে সেবা কার্যক্রম। শুধু ওষুধ আর চিকিৎসক সংকটই নয়; রয়েছে রাতে নার্স সংকটও। এত পরিমাণ শিশু রোগী সামলাতে স্বল্পসংখ্যক নার্সের গলদঘর্ম অবস্থা। এক বেডেই ভর্তি করা হচ্ছে তিন থেকে চারজন করে শিশু রোগী। কক্ষের ভেতরের মেঝে স্থান না পেয়ে বারান্দার মেঝে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন শত শত শিশু ও বয়স্ক রোগী। এ যেন স্বাস্থ্যসেবার এক চরম মানবেতর চিত্র। অসহায় সাধারণ মানুষ কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। তবু গণমাধ্যম কর্মীদের দেখে নানা ধরনের অবস্থাপনার কথা তুলে ধরেন তারা।
ডায়রিয়া ও শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, এমন বাজে অবস্থার দেখা হয়তো আর কোনো হাসপাতালে মিলবে না। চিকিৎসক, নার্স, ওষুধসহ সংকট রয়েছে সব কিছুর। রাতে বিপদগ্রস্ত রোগী যারা সেবা নিতে আসছেন তারা আরও বেশি বিপদে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিসক বা নিয়মিত চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে না। বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে অভ্যন্তরে সব ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করছেন ইন্টার্ন চিকিৎসক। অথচ এ সমস্যা সমাধানের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয় নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
কর্তব্যরত নার্সরা বলেন, ‘পর্যাপ্ত নার্স না থাকায় দায়িত্ব পালনে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমাদের। হাসপাতাল থেকে যতটুকু ওষুধ দিচ্ছে আমরা ততটুকু দিয়েই সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
শিশু ওয়ার্ডে দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসক মিলন মাহামুদ বলেন, এ সময়ে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন সবাই। একসঙ্গে বিভিন্ন রোগের রোগী গাদাগাদি করে ভর্তি থাকলে নানা ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে শিশুরা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে সেবা প্রদান বা গ্রহণ করা কোনোটাই সম্ভব হচ্ছে না হাসপাতালে।
হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের অভিভাবকরা বলছেন, বিগত বছরের তুলনায় এ বছরে শিশু ওয়ার্ডের রোগীর চাপ যে হারে বৃদ্ধি পয়েছে সেই তুলনায় সেবার মান বাড়েনি মোটেও। শীতের এ সময়ে বিশেষ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছেন রোগীর স্বজনরা।