Image description

আমাদের ত্রাণকর্তা, মুক্তিদাতা, তিনি দীনবেশে বেথলেহেমে জন্মগ্রহণ করেছেন। যেন আমরা পাপীতাপী মানুষেরা তার দয়ায় আমাদের জরাজীর্ণতা কাটিয়ে উঠতে পারি এবং তাকে নিয়েই জীবনযাপন করতে পারি। ত্রাণকর্তার জন্মবার্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা আর পাপের পরাধীনতায় বন্দি নই, বরং তার আলোতে আমরা স্বাধীন হয়ে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে বাস করব। 

প্রবক্তা ইসাইয়া তার ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন, আমরা যারা দুর্বল অসহায়, অন্যায্যতার শিকার, নির্যাতিত, বঞ্চিত, তাদের পাশে দাঁড়াতে, তাদের উদ্ধার করতে ঈশ্বর আসবেন, আমাদের ভয় কী! আমাদের প্রভু যিশু খ্রিস্ট যিনি আমাদের মুক্তিদাতা, জগৎত্রাতা ও বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের প্রভু তার দেহ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণতা পেয়েছিল। প্রভু যিশু স্বর্গ থেকে মর্ত্যে প্রেরিত হলেন, তিনি দেহ গ্রহণের মধ্য দিয়ে মানুষ হয়ে বেথলেহেমের গোশালায় অতি দীনবেশে জন্ম নিলেন। যাতে ছোট-বড়, ধনী-গরিব, পাপী-সাধু, সব এলাকার সব ভাষাভাষীর সব মানুষ তার কাছে যেতে পারি, তার আশীর্বাদ লাভ করতে পারি এবং তার দ্বারা মুক্তি লাভ করতে পারি। প্রভু যিশু আমাদের সবার জন্য দেহ গ্রহণ করলেন, জন্ম নিলেন এটাই প্রভু যিশুর জন্ম উৎসবের বড়দিনে আমাদের আনন্দের কারণ। এই আনন্দ সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রভু যিশু আমাদের প্রেরণ করেছেন। আমাদের দীক্ষাস্নানের মধ্য দিয়ে এই প্রেরণ দায়িত্ব আমাদের সবাইকে দেওয়া হয়েছে। আমাদের সবার কর্তব্য যেন এই দায়িত্ব আমরা বিশ্বস্তভাবে পালন করতে পারি। 

বড়দিন মুক্তিদাতা প্রভু যিশু খ্রিস্টের শুভ জন্মদিন। অনেক আনন্দ, উদ্দীপনা, বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে এই দিনটি খ্রিস্ট বিশ্বাসীরা উদযাপন করে থাকে। এই বড়দিনের মূল বার্তা হলো ঈশ্বর মানুষ হলেন, ঈশ্বরের মানুষ হওয়ার এই মৌলিক রহস্যময় ও আনন্দময় সত্যটি গ্রহণ, ধারণ ও উদযাপন করার সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টের দেহধারণ তত্ত্বটি নিয়েও ধ্যান করার সুযোগ আসে। এই সময়টিতে কেন না খ্রিস্ট দেহধারণ খ্রিস্ট বিশ্বাসীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা, শুধু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই নয় বরং বলা যায় খ্রিস্ট বিশ্বাসের কেন্দ্রীয় ঘটনা এই সত্যটিরই স্বীকৃতি দিয়ে ক্যাথলিক মণ্ডলীর ধর্ম শিক্ষা ৪৬৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘খ্রিস্ট বিশ্বাসের সুস্পষ্ট চিহ্ন হচ্ছে ঈশ্বর পুত্রের প্রকৃত দেহধারণের বিশ্বাস’। 

বিষয়টির উপর বাইবেলীয় ও মণ্ডলীর ধর্মশিক্ষার আলোকে কিছুটা আলোচনা ও অনুধ্যান, ঐশ্বরিক ও মানবিক এই দুটি স্বভাব রয়েছে। অনন্ত বাণী হিসেবে তিনি অনাদিকাল বিদ্যমান ছিলেন এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে ঈশ্বরের সঙ্গে এবং ঈশ্বর হিসেবে পিতার সঙ্গে অভিন্ন স্বরূপে বিদ্যমান ছিলেন বিধায় তিনি পরিপূর্ণ ঈশ্বর তিনি সৃষ্ট নন বরং পিতা থেকে জাত বিধায় তিনি পুত্র ঈশ্বর, একই সঙ্গে তিনি নারী গর্ভে জন্ম নিয়ে মানুষ হয়েছেন। সাধু পল বলেন, ‘যখন সময় পূর্ণ হলো, তখন ঈশ্বর এই পৃথিবীতে পাঠালেন তার আপন পুত্রকে; তিনি জন্ম নিলেন নারী গর্ভে, জন্ম নিলেন মোশীর বিধানের অধীন হয়ে।’ (গালা: ৪:৪)

একইভাবে ফিলিপীয়দের কাছেও তিনি লেখেন, ‘তিনি তো স্বরূপে ঈশ্বর হয়েও ঈশ্বরের সঙ্গে তার সমতুল্যতাকে আঁকড়ে থাকতে চাইলেন না, বরং নিজেকে তিনি রিক্ত করলেন; দাসের স্বরূপ গ্রহণ করে তিনি মানুষের মতো মানুষ হয়েই জন্ম নিলেন’ (ফিলি ২:৬-৭)। হিব্রুদের কাছে ধর্মপত্রে বলা হয়েছে, ‘এই জগতে আসার সময়ে খ্রিস্ট ঈশ্বরকে এই কথা বলেছিলেন, ‘বলিদান ও ফসসই তুমি তো চাওনি, বরং আমার জন্য গড়ে তুলেছ একটি দেহ তাই আমিও বলেছি; দেখ, এই তো আমি’ (হিব্রু ১০:৫-৭)। 

তাই আমরা বলতে পারি যে বড়দিন হলো যাবপাত্রে শোয়ানে ঈশ্বর, বড়দিন মুক্তিদাতা যিশু শিশু রূপ নয়, বড়দিন হলো এই শিশুর দেবত্ব, যিশু শিশু হয়ে জন্ম নিয়েছেন। এটা সত্য কিন্তু তার ঈশ্বরত্বকে কোনোভাবেই আড়াল করে নয়, মানবদেহের আড়ালে ঈশ্বরত্ব ঢেকে রেখে নয়, বরং ঈশ্বর তার পূর্ণ ঐশীসত্তা নিয়েই শিশু হয়েছেন, মানুষ হয়েছেন। তাই তো যিশু শিশু, কিন্তু এই শিশু প্রকৃত ঈশ্বর, এই শিশুর আড়ালে ঈশ্বরই লুক্কায়িত নয়; বরং ঈশ্বর শিশু হয়ে জগতের মাঝে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। এই ঈশ্বরকে নিয়েই আমরা বড়দিন উৎসব করি এবং সত্য ঈশ্বরকে প্রকাশ করি। 

ঈশ্বর যিনি বর্ণনাতীত, যাকে আমরা কল্পনা করেও কোনো উপসংহারে পৌঁছতে পারি না সেই ঈশ্বরকে আমাদের মাঝে পেয়ে, তাকে নিয়ে আনন্দ প্রকাশই বড়দিন। তাই দেখি বড়দিনে এই ঐশ সন্তানের জন্মের কারনেই স্বর্গ-পৃথিবীতে সর্বত্রই আনন্দে সাড়া পড়ে যায়। এই ব্যতিক্রম মহা শুভ সংবাদ দিতে স্বর্গদূতেরা আকাশে মুখরিত জয়গানে ‘জয় ঊর্ধ্বলোকে পরমেশ্বরের জয়! ইহলোকে নামুক শান্তি তার অনুগৃহীত মানবের অন্তরে!’ আর পৃথিবীতে রাখালেরা এমন অলৌকিক অপূর্ব আনন্দ সংবাদ পেয়ে দিশেহারা হয়ে এই খবর দিতে ছুটে চলল- ‘রাখালেরা য কিছু শুনল ও দেখল তার জন্য পরমেশ্বরের বন্দনা করতে করতে তার জয়গান গাইতে গাইতে তখন ফিরে গেল!’ পণ্ডিতেরা ছুটে এসে প্রণত হয়ে প্রণাম করল আর দিয়ে গেল যত উপহার, ভূমিষ্ঠ হয়ে তারা তাকে প্রণাম করলেন এবং নিজেদের রত্ন পেটিকা খুলে তাকে উপহার দিলেন সোনা, ধূপধুনো ও গন্ধ নির্যাস (মথি ২:১২)। এ সবকিছু কিন্তু শুধু এই শিশুর জন্য করা হয়নি বরং সবই করা হলো যাবপাত্রে শায়িত ঈশ্বরের জন্য।

যিশুর জন্ম মানুষের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম ঘটনা যিশু জন্মের চিহ্নস্বরূপ পুরোনো বছরের পঞ্জিকা বাতিল করা হয় এবং মানুষের ইতিহাসে নববর্ষের সূচনা হয়, যা আজ পর্যন্ত সব জাতি পালন করে আসছে। সুতরাং যিশুর জন্ম ইতিহাসকে দুযুগে ভাগ করে- ‘খ্রিস্টপূর্ব’ এবং ‘খ্রিস্টাব্দ’ এ দ্বারা প্রকাশ হয় যে যিশুর আগমন হলো মানুষের ইতিহাসের কেন্দ্র ও উৎস। 

ক) পালক দাউদের জন্মস্থানে যিশুর জন্ম হয় (লুক ২:৬)
খ) রাখালদের ঘরে যিশু জন্ম নেন (লুক ২:৭)
গ) যিশুর জন্মের প্রথম সংবাদ রাখালদের কাছে ঘোষিত হয় (লুক ২:৮)
ঘ) যিশুকে রাখালের সন্তানের মতো রাখা হয় এবং এই চিহ্নে তিনি সবার কাছে পরিচিত হন (লুক ২:১২)

লুক চান যেন সর্বযুগের মানুষ এই প্রথম রাখালদের মতো যিশুকে তাদের পালক হিসেবে চিনতে পারে এবং স্বীকার করে সানন্দে তাকে গ্রহণ করে। 
তাহলে আসুন আমরা এগিয়ে যাই সেই বেথলেহেমের জীর্ণগোশালায়। 

বিনম্রতা, দীনতা ও ভালোবাসা দিয়ে তার চরণ স্পর্শ করি তাহলে তিনি নতুন করে আমাদের হৃদয়ে জন্ম নেবেন আর এর মধ্য দিয়ে সার্থক করে তুলি স্বর্গ-মর্ত্যরে মহামিলন। বড়দিনে জীবনের সব ব্যর্থতাকে মুছে ফেলে খ্রিস্টভক্তরা তথা সমগ্র জগৎ নতুন সাজে, নিজেদের মনের সব পাপময়তাকে মুছে খ্রিস্টকে বরণ করে নব উদ্যমে। পরমেশ্বরের সঙ্গে মিলনের নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নতুন সমাজে প্রভুকে স্থান দিতে হয়। সাধু পল বলেন, ‘আজ কিন্তু রোষ-আক্রোশ অনিষ্ট-কামনা, কটুকথা, অশ্লীল কথাবার্তা এসব তোমরা ছাড়। পরস্পরের কাছে আর মিথ্যা বোলো না, পুরোনো মানুষটা পুরোনো পোশাকের মতো ছিঁড়ে ফেলে তোমরা পেয়েছ নতুন মানুষটিকে (কলসীয় ৩:৮-১০)। খ্রিস্টভক্তরা স্বয়ং খ্রিস্টকে পরিধান করে, যিনি বড়দিনে মানুষ হয়েছেন, খ্রিস্টকে ধারণ করে তার সঙ্গে মিলিত হয়ে উঠে এক নব সৃষ্টি (২করি ৫:১৭)। খ্রিস্টভক্ত ও বিশ্বাসী হিসেবে আমরা পরমেশ্বরের মনোনীতজন, তারই পুণ্যজন, পরস্পরের ক্ষমাদানে ও প্রদানে সবাই পরমেম্বরের প্রশংসাগান করে। ঈশ্বরের মহা অনুগ্রহদানে ধন্য হয়ে সম্প্রীতি ও শান্তিতে বাস করে।’ 

বড়দিন হলে উৎসবের দিন, পুরোনো যত ব্যথা বেদনা, হতাশা-নিরাশা, জরাজীর্ণতা ভুলে সম্প্রীতি ও শান্তির উৎসব, মঙ্গলসমাচারের আলোকে খ্রিস্টীয় ও সামাজিক মূল্যবোধে যিশুর দেহধারণে ঈশ্বরোপলব্ধিতে জীবন সাধনা। কেননা যিশুর দেহধারণের ফলেই স্বর্গের ঈশ্বর পৃথিবীতে এলেন, মিশে গেলেন মানবীয় সত্তায়। জগতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শান্তি। আসুন প্রতিদিনকার কাজ-কর্মে, ধ্যানে-জ্ঞানে ও জীবন সাধনায় শান্তির বরপুত্র যিশুকে অন্তরে ধারণ ও বহন করি। মিলেমিশে জীবনযাপন করে মেতে উঠি সম্প্রীতি ও শান্তির উৎসবে।

লেখক: ক্যাথিড্রাল ধর্মপল্লী, পাথরঘাটা চট্টগ্রাম আর্চডায়োসিস