Image description

মারওয়ান বিশারা আলজাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি বিশ্বরাজনীতি নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি করেছেন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত বিষয়ে একজন প্রথম সারির বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। পূর্বে তিনি আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব প্যারিসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আলজাজিরায় প্রকাশিত এ লেখাটি সময়ের আলোর জন্য অনুবাদ করেছেন চৈতী সাহা।

গত বছরের অন্য সব ঘটনাকে ছাপিয়ে একটা ঘটনা আমাকে বারবার তাড়িত করেছে। এক ক্ষমার অযোগ্য এবং অবিস্মরণীয় দৃশ্য যা প্রতিধ্বনিত হয়েছিল সারা বিশ্বে। ভীষণরকম প্রতীকী এই ঘটনা একই সঙ্গে দুঃখজনক এবং বীরত্বপূর্ণ। টিভির পর্দায় লাইভ হতে শুরু করা এই দৃশ্য দেখে আমি এবং আমার সহকর্মীরা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম একে অন্যের দিকে, মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম আমরা, আলজাজিরার শিরিন আবু আকলেহকে হত্যার মাত্র তিন দিন পর ইসরাইল দ্বিগুণ উৎসাহে তার অপকর্মের গতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল। শিরিনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় আক্রমণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যাতে তার ফিলিস্তিনি পরিচয়কে ধ্বংস করা যায়।

যেই মাত্র শোকার্তরা পূর্ব জেরুজালেমের অধিকৃত সেন্ট জোসেফ হাসপাতালের আঙ্গিনায় শান্তিপূর্ণভাবে জড়ো হয়ে কফিনটি বহন করে এবং শিরিনের শেষ বিশ্রামস্থলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়, ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী মিছিলটি থামানোর জন্য চার্জ করে। নিষ্ঠুরভাবে শোকার্তদের লাঞ্ছিত করে পুলিশ বাহিনী, লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটায়। কফিন কাঁধে নেওয়া শবযাত্রীরা পুলিশের লাঠির আঘাত থেকে নিজেদের দেহ রক্ষা করতে পারছিল না।

কিন্তু এই সাহসী ফিলিস্তিনিরা কাস্কেট ধরে দাঁড়িয়ে রইল। প্রায় মাটিতে পড়ে যেতে থাকা কফিনটির পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য সেটা সামলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। শিগগিরই হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মিছিলে যোগ দিয়ে এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিছিলে পরিণত করল। শুধু তাদের জন্যই না, বিশ্বের অগণিত স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য শিরিন স্বাধীনতা এবং ত্যাগের প্রতীক হয়ে উঠল।

এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এটাই সবাইকে দেখানো হয়েছে যে, শিরিন সারাজীবন যে পেশায় কাটিয়েছেন, সেটি অত্যন্ত খারাপ একটি পেশা, নিষ্ঠুর এই পেশার পরিণতিও হয় দুঃখজনক। শিরিন নিজে যদি এই ঘটনার রিপোর্ট করতেন তিনি সম্ভবত কম আশ্চর্য হতেন আর অনেক বেশি শান্ত থাকতেন কারণ এই আক্রমণের কারণ শুধুই কাপুরুষতা। ফিলিস্তিনিরা জানে তাদের জাতীয় পতাকার চারপাশে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেওয়া ‘ফ্রি ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগানের চেয়ে বেশি ভয় শক্তিশালী পারমাণবিক রাষ্ট্র আর কিছুকে পায় না।

যদি ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে রাস্তায় কোনো ধরনের শবযাত্রার মিছিল হতে না দেওয়া, তাহলে তারা সহজেই রাস্তা থেকে বের হওয়ার পথ বন্ধ করতে পারত। কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সামনে ফিলিস্তিনিদের আঘাত করা এবং অপমান করা। বিশ্বকে দেখানোর জন্য যে ইসরাইল যা খুশি তা করতে পারে, সে যেমন চায়, যখনই চায়, ইসরাইল তার পশ্চিমা সমর্থকদের, বিশেষ করে আমেরিকান পৃষ্ঠপোষকদের কাছে স্পষ্ট করে দিতে চাইল যে ইসরাইলের ওপর তাদের কোনো কর্তৃত্ব নেই, এমনকি কোনো ফিলিস্তিনি আমেরিকান সাংবাদিকের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যার ক্ষেত্রেও।

কেন? কারণ ইসরাইল ক্ষমতায় মত্ত, উন্মাদ হয়ে গেছে।

ইতিহাসের অনেকটা সময় ধরে ইসরাইল তার নিষ্ঠুরতা গোপন করার, তার সহিংসতাকে আড়াল করার এবং উদারপন্থি পশ্চিমা শক্তির অনুগ্রহ লাভের জন্য তার বর্ণবাদকে ছদ্মবেশ দেওয়ার জন্য কঠোর চেষ্টা করেছিল। সহিংসতার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেলে তার জন্য মুখস্থ দাবি সর্বদা একই ছিল, ‘নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য আমরা এটি করতে বাধ্য হয়েছি, এ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না।’ এককথায় বলতে গেলে ইসরাইলিরা লুটতরাজ, হত্যা এবং তারপর মায়াকান্নাকে শিল্পে পরিণত করেছিল।

কিন্তু আজকের ইসরাইল তার বর্ণবাদী সহিংসতার বিষয়ে আর লজ্জিত নয়, সে রাষ্ট্রের নেতৃত্বে যেই থাকুক না কেন। ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদ এবং হলোকাস্টের দগদগে ঘা যেসব ইহুদিবাদীর মনে রয়ে গিয়েছিল তারাই শুধু ব্যতিক্রম, পশ্চিমা চাপকেও গ্রহণ করতে হয়েছিল তাদের, নতুন প্রজন্মের ইসরাইলে জন্মগ্রহণকারী ইহুদি, গোঁড়া ধার্মিক এবং অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের ফ্যাসিস্টদের মতো আচরণ করতে কোনোই দ্বিধা কাজ করত না।

শিরিনের শান্তিপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় আক্রমণকারী রোবোকপ-টাইপ গুণ্ডারা আর যারা তাকে হত্যা করার পর তার বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল, এদের কারোরই আর মানবিক কোনো জ্ঞান বা বিবেক অবশিষ্ট নেই। তাদের নেতাদের মতো তাদের কাউকেও কোনো অপরাধের জন্য দায়ী করা হয়নি। অন্য দুঃশাসনব্যবস্থার রাষ্ট্রে অপরাধীদের বিচার না হলেও অন্তত ভর্ৎসনা করা হয়, ইসরাইলের উজ্জ্বল ব্যতিক্রম, এখানে সবরকম আগ্রাসনের জন্য পুরস্কৃত হওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে- যত বড় অপরাধ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্যের কাছ থেকে পুরস্কার তত বেশি। একটু দেরিতে হলেও মধ্যপ্রাচ্য এই মহাযজ্ঞে যোগদান করেছে, ইসরাইলকে তার আগ্রাসনের জন্য পুরস্কৃত করেছে এই নীতিতে- ‘যদি আপনি তাদের হারাতে না পারেন তাহলে তাদের সঙ্গে যোগ দিন’।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে বারবার অপমান ও অবজ্ঞা করার পর নেতানিয়াহুকে মার্কিন সামরিক সহায়তায় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার পুরস্কৃত করা হয়েছিল। গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের নির্দয় বোমাবর্ষণ এবং আল-আকসা মসজিদে আক্রমণকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল ইউরোপীয় বিনিয়োগ সাহায্যের মাধ্যমে।

এ ধরনের জঘন্য তোষণ ইসরাইলকে একেবারে পাগল করে দিয়েছে। একটি অবাধ্য শিশুর মতো এটি ক্রমাগত খারাপ আচরণের সীমানা পরীক্ষা করে যাচ্ছে, কৌতূহলী হয়ে অপেক্ষা করছে কখন এর পৃষ্ঠপোষকরা ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে তাকে শাসন করবে, শুধু তখনই এর বদমেজাজের ঘোর কাটবে, কোনো লাভ হয়নি। ইসরাইলিরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, আগ্রাসন কেবল অনুমোদিত নয়, এটি বেশ বড় অঙ্কের অর্থও প্রদান করে। তথাকথিত মধ্যপন্থি সরকার ২০০৬ সাল থেকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জন্য ধ্বংসাত্মক স্মৃতি তৈরি করার পরেও তারা রাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থি সরকারকে নির্বাচিত করে, এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে বাধ্য।

মিডিয়াকে ঘৃণা করে এবং আন্তর্জাতিক জনমতের বিষয়ে চিন্তা করেন না এমন ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতায় বসান। তারা ইসরাইলের আইনি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে একটি নতুন ফ্যাসিবাদী ধর্মতন্ত্রে রূপান্তরিত করতে চায়, একই সঙ্গে দাবি করে যে রাষ্ট্রের বর্ণবাদ ও সহিংসতাকে আইনি বিধিনিষেধ এবং বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধান থেকে মুক্ত করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় তারা তাদের ইহুদি স্বদেশিদের খুব উদার, ধর্মনিরপেক্ষ বা সমকামী হওয়ার জন্য আহ্বান জানায়, ফিলিস্তিনিদের মতো না হওয়ার জন্য ইহুদিদের উদ্বুদ্ধ করে, একজন অভিজ্ঞ ইসরাইলি সাংবাদিককে এটি বলতে প্ররোচিত করে যে, ‘জায়োনিজম হলো বর্ণবাদ’।

প্রকৃতপক্ষে সরকারের নতুন ইশতেহারে ঘোষণা করা হয়েছে যে ইহুদি জনগণের ‘ইসরাইলের ভূমির সব অংশের একচেটিয়া এবং অবিচ্ছেদ্য অধিকার’ অর্থাৎ সব ঐতিহাসিক প্যালেস্টাইনের প্রতি। 

উদীয়মান তারকা এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির আলজাজিরা বন্ধ করার এবং এর সাংবাদিকদের বহিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। ইনি হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যাকে তার চরম দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে কাজ করা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং যিনি ১৯৯৪ সালে হেবরনে ২৯ জন নিরপরাধ ফিলিস্তিনি গণহত্যায় উল্লাস করেছিলেন। তিনি আল জাজিরাকে ‘একটি ইহুদি বিরোধী এবং মিথ্যা প্রচারণা নেটওয়ার্ক’ বলে অভিহিত করেছেন। এটা শুনে শিরিন নিশ্চয়ই বিস্মিত না হয়ে পারত না।

লেখক: আলজাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক