জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কৌশলে শক্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি ইতিমধ্যে শতাধিক আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনি মাঠে নেমেছে।
জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম সময়ের আলোকে বলেন, জামায়াত সবসময় নির্বাচনমুখী দল। সাংগঠনিক প্রস্তুতি শতভাগ রয়েছে। আমাদের প্রস্তুতির ধরন বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের মতো নয়। জামায়াত ইতিমধ্যে শতাধিক আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে ৫ সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে জামায়াত। কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মুহাম্মাদ ইজ্জত উল্লাহ। আরও রয়েছেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আজাদ ও সাবেক শিবির সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত। যেসব উপজেলায় দলটির চেয়ারম্যান কিংবা ভাইস চেয়ারম্যান আছে সেসব নির্বাচনি এলাকায় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তারা সামাজিক কর্মসূচির আদলে নিয়মিত রুকন সমাবেশ, দাওয়াতি ও সাংগঠনিক কাজ করে যাচ্ছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে জামায়াত কৌশলে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, জনগণ বুঝে গেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকারের অধীনে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। জামায়াতও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। সরকারের প্রলোভনে পড়ার সম্ভাবনা জামায়াতের নেই।
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির মিত্র জামায়াতে ইসলামী রাজপথে সক্রিয় হচ্ছে। তারা দলের আমিরের মুক্তি, সুষ্ঠু নির্বাচনসহ নানা দাবিতে মাঠে নামছে। জামায়াত নেতাদের মতে, চূড়ান্ত আন্দোলনে যাওয়ার আগে রিহার্সাল হিসেবে সমাবেশ, বিক্ষোভ কিংবা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। সামনে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনেও শরিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা আজ পল্টনে বায়তুল মোকাররমের সামনে সমাবেশ করবে। তাদের প্রস্তুতিও ব্যাপক রয়েছে। সমাবেশ করতে পুলিশ জামায়াতকে বেশ কিছু বিধিনিষেধ ও শর্ত দিয়েছে। জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, তারা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করেই কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। অনুমতি দিয়ে রাজপথে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান জানান দিতে চান। সংঘাত এড়িয়ে ব্যাপক শোডাউন করতে চায় সংগঠনটি। কারণ অনুমতি ছাড়া মাঠে নেমে তাদের নেতাকর্মী গ্রেফতারের কবলে পড়ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সংগঠন। তখন পাশে পাচ্ছেন না মিত্রদের। এ জন্য জামায়াত এই কৌশল বেছে নিয়েছে।
জামায়াত সবশেষ যুগপৎভাবে গত ৩০ ডিসেম্বর গ্রেফতারের ঝুঁকি নিয়ে গণমিছিলের কর্মসূচি পালন করে। পুলিশের অনুমতি না পেলেও যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে জামায়াত মাঠে নামলে মৌচাকে পুলিশের বাধায় পড়ে। সেখানে দলটির অর্ধশত নেতাকর্মী আহত ও গ্রেফতার হন।
এলডিপিসহ কয়েকটি দল জামায়াতের মিছিলে বাধার নিন্দা করলেও বিএনপি নীরব ছিল। এর আগে গত ১৩ ডিসেম্বর জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর তার মুক্তি দাবি করে বক্তব্য দেয়নি বিএনপি। ঢাকায় ১০ ডিসেম্বরের গণসমাবেশে বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিসহ ১০ দফা ঘোষণা করে।
জামায়াত আমির এর আধ ঘণ্টা পর ১০ দফা ঘোষণা করে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি দেন। জামায়াতের দাবি, শুধু কর্মসূচি পালন করার কারণে দলের আমির গ্রেফতার হয়ে এক মাস ধরে জেলে। কিন্তু বিএনপি একটি শব্দও বলেনি। ২৪ এবং ৩০ ডিসেম্বরের গণমিছিল থেকে সারা দেশে জামায়াতের ৩ শতাধিক কর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের জন্য একটি বিবৃতিও দেয়নি। যদিও ৮ ডিসেম্বর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের গ্রেফতারের পর জামায়াত মুক্তি দাবি করে বিবৃতি দেয়।
যুগপৎ আন্দোলন প্রসঙ্গে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের সময়ের আলোকে বলেছেন, যা হওয়ার হয়েছে। লিয়াজোঁ কমিটির মধ্যে কিছু সমন্বয়হীনতা ছিল। এখন আন্দোলন নিয়ে ইতিবাচক আলাপ-আলোচনা চলছে বিএনপির সঙ্গে। দেখা যাক সামনে কী হয়।
২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির পর রাজধানী ঢাকায় মিছিল-সমাবেশ করার অনুমতি পায়নি জামায়াত। এর পর থেকে ঝটিকা মিছিলে সীমাবদ্ধ দলটির তৎপরতা।
দীর্ঘ ১০ বছর পর গত ২৪ এবং ২৮ ডিসেম্বর ডিএমপিতে আবেদন করে গণমিছিলের অনুমতি চেয়ে। ৩০ ডিসেম্বরের মৌচাকের সংঘর্ষের পর ডিএমপি কমিশনার কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিলেও জামায়াত এর জবাবে বিবৃতিতে জানায়, পুলিশের ওপর আস্থা রয়েছে, শত্রুতা নেই। সম্প্রতি ৫ জুন রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করার কথা ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর। সেজন্য অনুমতিও চেয়েছিল। কিন্তু এদিন পুলিশ অনুমতি না দেওয়ায় সংঘাত এড়াতে কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনে দলটি।
আজ শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করতে পুলিশের অনুমতি চেয়েছিল জামায়াত। এ সমাবেশ সফল করতে জামায়াত ঘরোয়াভাবে অন্তত ডজনখানে সমন্বয় সভা করেছে। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তারা সব ওয়ার্ডের আমির ও সেক্রেটারির সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম সময়ের আলোকে বলেন, আসলে আমাদের মূল উদ্দেশ্য কর্মীদের চাঙ্গা করা। দীর্ঘদিন ধরে আমরা মাঠে কর্মসূচি পালন করতে পারছি না। নির্বাচন সামনে রেখে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করা দরকার। রাজনৈতিক দল হিসেবে রাজপথে না নামলে সাংগঠনিক মান উন্নয়ন হয় না।
এদিকে বিএনপি এবং সমমনা জোটের যুগপৎ আন্দোলনে ঈদের পর শামিল হতে পারে জামায়াত। এমন ইঙ্গিত দিয়ে আবদুল হালিম বলেন, বিএনপির মহাসচিবের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হচ্ছে। আরও আলোচনা হবে। আন্দোলনের ধরন নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চূড়ান্ত আন্দোলনে একসঙ্গে মাঠে নামবে জামায়াত। এখন বিএনপি বলছে, আমাদের মাঠে থাকতে। আমরা তো আছি। বিএনপিও তাদের কর্মসূচি পালন করছে। কিছু মনোমালিন্য ছিল তা আলোচনার মাধ্যমে চুকিয়ে যাচ্ছে। রাজপথের কর্মসূচিই আমাদের এক করে দেবে।
১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৭৬টি আসনে মনোনয়ন দিয়েছিল। ওই নির্বাচনে দলটি ১০টি আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে জামায়াত। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসনে বিজয়ী হয়। এই নির্বাচনে দলটি ২২২ জন প্রার্থী দিয়েছিল। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত তিনটি আসনে জয়ী হয়। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনে জামায়াত ১৭টি আসন পায়। মহিলা আসন থেকে ৪টিতে জয়ী হয় তারা। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত দুটি আসনে বিজয়ী হয়। ওই নির্বাচনে দলটি জোটগতভাবে ৩৯টি ও ৪টিতে এককভাবে নির্বাচন করে।
২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন (ইসি) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বরে দলটিকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালে হাইকোর্টে করা রিট মামলার রায়ে তাদের নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। সে কারণে নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে। তবে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে আপিল করেছিল দলটি। এখনও তার নিষ্পত্তি হয়নি।
এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম বলেন, নিবন্ধন ফিরে না পেলে আমরা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করব। হয়তো বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা কিংবা নির্বাচনকালীন জোটও হতে পারে। তবে এখনই তা স্পষ্ট বলা যাচ্ছে না।