দিন দিন নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে রমরমা মাদক কারবার চালাচ্ছে একশ্রেণির অপরাধী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদক পাচার প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপ নিলেও পাচারকারীদের কৌশলের যেন শেষ নেই। তারা নানা কৌশলে মাদক পাচার এবং বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। অনেক সময় পাচারকারীদের নিত্যনতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল দেখে হতবাক হয়ে পড়েন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা।
পেটের ভেতরে, শুকনো মরিচ, জুতা, ইলিশ মাছ, কচ্ছপ, মুড়ির মোয়া, লাউ, ডাব, সবজির ট্রাক, পরিবহনের সিট কেটে তার ভেতরে এবং নারীদের অন্তর্বাসের ভেতর-এমন সব নানা কায়দায় ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক পাচার করে কারবারিরা।
বিভিন্ন কৌশলে সীমান্ত এলাকা থেকে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক সংগ্রহ করে রাজধানীতে নিয়ে আসা হয়। এসব মাদকদ্রব্য পার্টি সেন্টার, বস্তি এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে তারা। গাঁজা, ফেনসিডিল এবং ইয়াবার চাহিদা থাকে সবসময়ই। এর সঙ্গে ‘এলএসডি, ‘ক্রিস্টাল মেথ’ বা ‘আইসের’ মতো মাদকের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গত ২১ মে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার
মহাসড়কে অভিযান চালিয়ে মুড়ির মোয়ার ভেতর থেকে ১২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে র্যাব। এ সময় গ্রেফতার করা হয় প্রিয়তোষ মজুমদার (৫০) নামে একজনকে। র্যাব জানায়, প্রিয়তোষ দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার থেকে মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করে নগরের বিভিন্ন এলাকায় পাইকারি এবং খুচরা বিক্রি করে আসছেন। তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতেন। মুড়ির মোয়ার ভেতরে নতুন কৌশলে পলিথিন ও স্কচটেপ দ্বারা বিশেষ পদ্ধতিতে ইয়াবা পাচার করতেন। তিনটি মুড়ির মোয়ার প্যাকেটে থাকা ২৭টি মোয়ার ভেতরে মোট ১২ হাজার পিস ইয়াবা বহন করছিলেন তিনি।
গত ২৪ মে রাজধানীর নটর ডেম কলেজের সামনে থেকে পেটের ভেতরে থাকা ইয়াবাসহ ৬১ বছরের ওয়াজ উদ্দিন নামে এক বৃদ্ধকে গ্রেফতার করে র্যাব। তিনি অদ্ভুদ এক কৌশলে ইয়াবা পাচার করছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে এক্সরে করালে শণাক্ত হয় তার পেটের মধ্যে থাকা ইয়াবা। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করিয়ে তার পেট থেকে ৩৭০০ পিস ইয়াবা বের করা হয়।
র্যাব জানায়, ২০২২ সালে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ১১ হাজার ৩০৭ জনকে এবং চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৫ হাজার ৭২৭ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। ২০২২ সালে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৫ পিস ও চলতি বছরের ৪ মাসে ২৫ লাখ ৬৮ হাজার ২৯৩ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে র্যাব। এ ছাড়াও হেরোইন ১১২ কেজি, ফেনসিডিল ২ লাখ বোতল, দেশি-বিদেশি মদ ২ কোটি লিটার, গাঁজা ৩২ হাজার কেজি এবং আইস ১৮ কেজি উদ্ধার করা হয়।
দেশে মাদকসেবীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষও নিয়মিত মাদক সেবন করে। দেখা যায়, রাজধানীর অভিজাত ও জনবহুল এলাকায় আবাসিক ভবনে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মাদক কারবার পরিচালনা করা হয়। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বনশ্রী, মোহাম্মদপুর, পুরান ঢাকা, শ্যামলী, মিরপুর, বারিধারা এবং উত্তরা এলাকায় রমরমা মাদক কারবারিদের আস্তানা রয়েছে। এসব আস্তানায় বেশিরভাগ স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা যায়। সেখানে নিরাপদে মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকা-ে লিপ্ত হওয়ার সুযোগও পেয়ে থাকে তারা। রাজধানীতে এসব কাজে জড়িত রয়েছে শতাধিক চক্র। একেকটি চক্রে ৮ থেকে ১০ জন সদস্য রয়েছে। এসব চক্রের সদস্যরা নতুন নতুন কৌশলে মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।
একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, মাদক ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু পাল্লা দিয়ে চোরাকারবারিরা রাজধানীতে মাদকের চালান নিয়ে আসার কৌশল বদলায়। তাই সীমান্ত দিয়ে মাদকের চালান আসা যেন বন্ধ হয়, সে বিষয়ে কাজ করতে হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার মো. ফারুক হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, রাজধানী ঢাকায় কোনো মাদক তৈরি হয় না। নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে মাদক ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। দেশের সীমান্ত এলাকা থেকে আসা মাদক নিয়মিত অভিযানে জব্দ করা হচ্ছে। এ ছাড়া মাদক সেবনকারী ও কারবারিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) শেখ মুহাম্মদ খালেদুল করিম সময়ের আলোকে বলেন, মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের কৌশল পরিবর্তন করাটাই স্বাভাবিক। তবে কৌশল পরিবর্তন করলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নতুন নতুন প্রযুক্তি ও সোর্স ব্যবহার করে তাদের আইনে আওতায় আনছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সময়ের আলোকে বলেন, মাদক কারবারিরা নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে মাদক সরবরাহ করছে। আমরাও প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের গ্রেফতার করে আইনে আওতায় নিয়ে আসছি। মাদক কারবারিদের গ্রেফতারে র্যাব প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই কাজ করে আসছে।
এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতির কারণে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাদক আসছে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আরও কঠোর হতে হবে। যাতে মাদক সহজলভ্য না হয়। মাদক পাচারকারিরাও যেমন নতুন নতুন কৌশাল অবলম্বন করছে তেমন আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তথ্য-প্রযুক্তির সহযোগিতায় তাদের গ্রেফতার করছে।
অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সন্তানদের প্রতি নজরদারি বাড়াতে হবে। তাদের সন্তানের পকেট খরচ বেড়ে যাচ্ছে কী না, বেশি রাতে বাড়ি ফেরে কি না, নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যায় কি না, দেরি করে ঘুম থেকে উঠে কি না ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি নজর রাখতে হবে। পিতা-মাতাকে সন্তানকে বেশি করে সঙ্গ দিতে হবে।